১.
এক রাজার সাত রানি। দেমাকে, বড়ো রানিদের মাটিতে পা পড়ে না। ছোটো রানি খুব শান্ত। এই জন্য রাজা ছোটো রানিকে সকলের চাইতে বেশি ভালোবাসিতেন।কিন্তু, অনেক দিন পর্যন্ত রাজার ছেলেমেয়ে হয় না। এত বড়ো রাজ্য, কে ভোগ করিবে? রাজা মনের দুঃখে থাকেন।এইরূপে দিন যায়। কতদিন পরে— ছোটোরানির ছেলে হইবে। রাজার মনে আনন্দ আর ধরে না; পাইক-পিয়াদা ডাকিয়া, রাজা, রাজ্যে ঘোষণা করিয়া দিলেন— 'রাজা রাজভান্ডার খুলিয়া দিয়াছেন, মিঠাইমণ্ডা মণি-মানিক যে যত পারো, আসিয়া নিয়া যাও।'বড়োরানিরা হিংসায় জ্বলিয়া মরিতে লাগিল।রাজা আপনার কোমরে, ছোটোরানির কোমরে, এক সোনার শিকল বাঁধিয়া দিয়া বলিলেন, 'যখন ছেলে হইবে, এই শিকলে নাড়া দিয়ো, আমি আসিয়া ছেলে দেখিব!' বলিয়া রাজা রাজদরবারে গেলেন ।ছোটোরানির ছেলে হইবে, আঁতুড়ঘরে কে যাইবে? বড়োরানিরা বলিলেন, 'আহা ছোটোরানির ছেলে হইবে, তা অন্য লোক দিব কেন? আমরাই যাইব।'
বড়োরানিরা আঁতুড়ঘরে গিয়াই শিকলে নাড়া দিলেন। অমনি রাজসভা ভাঙিয়া, ঢাক-ঢোলের বাদ্য দিয়া, মণি-মানিক হাতে ঠাকুর-পুরুত সাথে, রাজা আসিয়া দেখেন— কিছুই না!
রাজা ফিরিয়া গেলেন ।
রাজা সভায় বসিতে না-বসিতেই আবার শিকলে নাড়া পড়িল ৷
রাজা আবার ছুটিয়া গেলেন। গিয়া দেখেন, এবারও কিছুই না। মনের কষ্টে রাজা রাগ করিয়া বলিলেন, 'ছেলে না-হইতে আবার শিকল নাড়া দিলে, আমি সব রানিকে কাটিয়া ফেলিব।' বলিয়া রাজা চলিয়া গেলেন৷
একে একে ছোটোরানির সাতটি ছেলে একটি মেয়ে হইল। আহা ছেলেমেয়েগুলি যে-চাঁদের পুতুল-ফুলের কলি । আঁকুপাঁকু করিয়া হাত নাড়ে, পা নাড়ে— আঁতুরঘর আলো হইয়া গেল ।
ছোটোরানি আস্তে আস্তে বলিলেন, 'দিদি, কী ছেলে হইল একবার দেখাইলি না !”
বড়োরানিরা ছোটোরানির মুখের কাছে রঙ্গ-ভঙ্গি করিয়া হাত নাড়িয়া, নথ নাড়িয়া, বলিয়া উঠিল, 'ছেলে না, হাতি হইয়াছে— ওর আবার ছেলে হইবে! কয়টা ইঁদুর আর কয়টা কাঁকড়া হইয়াছে। শুনিয়া ছোটোরানি অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া রহিলেন ।
নিষ্ঠুর বড়োরানিরা আর শিকলে নাড়া দিল না। চুপিচুপি হাঁড়ি-সরা আনিয়া, ছেলেমেয়েগুলিকে তাহাতে পুরিয়া, পাঁশগাদায় পুঁতিয়া ফেলিয়া আসিল। আসিয়া, তাহার পর শিকল ধরিয়া টান দিল।
রাজা আবার ঢাক-ঢোলের বাদ্য দিয়া, মণি-মানিক হাতে ঠাকুর-পুরুত সঙ্গে আসিলেন; বড়োরানিরা হাত মুছিয়া, মুখ মুছিয়া তাড়াতাড়ি করিয়া কতকগুলি ব্যাঙের ছানা, ইঁদুরের ছানা আনিয়া দেখাইল। দেখিয়া, রাজা আগুন হইয়া, ছোটোরানিকে রাজপুরীর বাহির করিয়া দিলেন।
বড়োরানিদের মুখে আর হাসি ধরে না; পায়ের মলের বাজনা থামে না, সুখের কাঁটা দূর হইল; রাজপুরীতে আগুন দিয়া, ঝগড়া-কোন্দল সৃষ্টি করিয়া, ছয় রানিতে মনের সুখে ঘরকন্না করিতে লাগিলেন ।
পোড়াকপালি ছোটোরানির দুঃখে গাছ-পাথর ফাটে, নদী-নালা শুকায়— ছোটোরানি ঘুঁটে-কুড়ানি দাসী হইয়া, পথে পথে ঘুরিতে লাগিলেন।
১ম পর্ব
সাত ভাই চম্পা | দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
১ম পর্ব
সাত ভাই চম্পা | দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
১ম পর্ব